News গওহরজান: উপমহাদেশের প্রথম রেকর্ডকরা কণ্ঠসাম্রাজ্ঞীর অসাধারণ এক অধ্যায়

গওহরজান: উপমহাদেশের প্রথম রেকর্ডকরা কণ্ঠসাম্রাজ্ঞীর অসাধারণ এক অধ্যায়

সোশ্যাল শেয়ার

গওহরজান

উনবিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষ—যখন সঙ্গীতজগৎ ছিল নবাবি দরবার, রাজপুত্রের আসর আর উচ্চশ্রেণির শিল্পানুরাগীদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ—সেই সময়েই এক নারী নিজের প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব ও বর্ণাঢ্য জীবনাচরণের মাধ্যমে হয়ে ওঠেন অদ্বিতীয়। তিনি গওহরজান। উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম যে কণ্ঠ রেকর্ড হয়—সে-ও ছিল তাঁরই। শুধু একজন শিল্পী নন, গওহরজান ছিলেন এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নাম।

তাঁর জীবনের অনেক ঘটনাই কিংবদন্তির মতো শোনা যায়। তার মধ্যে অন্যতম—‘দাতিয়া–ওরছা’র রাজদরবারে তাঁর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া চমকপ্রদ ঘটনা।

গওহরজান দাতিয়া–ওরছার রাজসভা: দম্ভ, অনুশোচনা শিল্পীসত্তার জয়

সেসময় গওহরজান ছিলেন সঙ্গীতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাজ্ঞী। কলকাতার চৌরঙ্গি থেকে শুরু করে রেঙ্গুন, দিল্লি, লখনৌ—যেখানেই যেতেন, রাজা-নবাবরা তাঁর সম্মানার্থে রাজকীয় আয়োজন করতেন। বলা হতো—গওহরজান যেখানে প্রবেশ করেন, সেখানে সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধতা, চাকচিক্য ও কিংবদন্তিও প্রবেশ করে।

একদিন দাতিয়া–ওরছার মহারাজ ভবানী সিংহ বাহাদুর তাঁর রাজ্যে অনুষ্ঠানের জন্য গওহরজানকে আমন্ত্রণ জানালেন। পারিশ্রমিক নির্ধারণ হলো—দৈনিক ২ হাজার টাকা। মনে রাখতে হবে, এটি সেই সময়ের অর্থমূল্য যখন ভারতবর্ষের বহু অঞ্চলে একজন সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক পারিশ্রমিক ছিল মাত্র কয়েক আনা। অথচ গওহরজান—যিনি নিজের পোষা বিড়ালের বিয়েতে খরচ করেছিলেন ১২ হাজার টাকা—এ রকম আমন্ত্রণ তিনি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনই অনুভব করলেন না।

তিনি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু দাতিয়া–ওরছার যুবরাজের রাজ্যাভিষেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে গওহরজান ছাড়া আয়োজন পূর্ণ হয় না—এ কথা মহারাজ ভালো করেই জানতেন। শেষমেশ বহু অনুরোধ-অনুনয়ের পর গওহরজান রাজি হলেন।

তাঁর আগমন ছিল এক রাজকীয় শোভাযাত্রার মতো; সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ১১১ জনের বিশাল দল, ১০ জন ধোপা, ৪ জন নাপিত, ২০ জন খিদমতগার, ৫ জন দাসী, ৫টি ঘোড়া, ৫ জন সহিস এবং সর্বশেষে তাঁর প্রশিক্ষিত বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা, যারা অনুষ্ঠানকে চূড়ান্ত বৈভবময় করে তুলেছিলেন।

একজন শিল্পীর সঙ্গে এমন বাহিনী নিয়ে আগমন সেই সময়ে একেবারেই বিরল ছিল না, কিন্তু গওহরজানের দলের আকার ও ব্যয় ছিল নজিরবিহীন।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রথম চার দিন, তারপর পাঁচ দিন, তারপর এক সপ্তাহ কেটে গেল—মহারাজ গওহরজানকে গান গাইতে ডাকলেন না! তবে প্রতিদিন ঠিকই পাঠাতেন তাঁর ২ হাজার টাকার সম্মানী ও রাজসিক উপহার।

গওহরজান মনে মনে বুঝলেন—এ যেন এক গভীর শিক্ষা। মহারাজ তাঁর অহঙ্কারের প্রতিচ্ছবি তাঁকে দেখাতে চেয়েছেন। অবশেষে তিনি লুকিয়েই দেখা করতে গেলেন রাজার সঙ্গে। বুঝলেন, তিনি একজন শিল্পী—অহংকার তাঁকে মানায় না। তাঁর উপলব্ধি ও মানবিকতা মহারাজকেও মুগ্ধ করল।

লোকমুখে শোনা যায়—এই উপলব্ধির পরই গওহরজান তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অনুষ্ঠানটি করেন দাতিয়া–ওরছার রাজসভায়। সেই গানের রেশ বহু বছর ধরে রাজ্যের মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছে।

গওহরজানের বিস্ময়কর জীবন: রেকর্ড, রাজদরবার এক কিংবদন্তির উত্থান

উপমহাদেশের প্রথম রেকর্ডকরা কণ্ঠ

১৯০২ সালে ব্রিটিশ গ্রামোফোন কোম্পানি ভারতবর্ষে রেকর্ড করার জন্য শিল্পী খুঁজছিলেন। তখনকার রেকর্ডের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৩ মিনিট। এমন শিল্পী খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল, যিনি জটিল ঠুমরি বা খেয়ালের সৌন্দর্য তিন মিনিটে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। গওহরজান ছিলেন একমাত্র উপযুক্ত শিল্পী। তাঁর রেকর্ড করা ঠুমরির শেষে বিখ্যাত ঘোষণা—
“My name is Gauhar Jaan!” এই পরিচিতি বাক্যটি সঙ্গীত ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

গওহরজান ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, যিনি ঠুমরি, দাদরা, খেয়াল, ভজন, গজল এবং কথক নৃত্যে সমানভাবে দক্ষ ছিলেন; জীবনের অঙ্গ হিসেবে তিনি ৬০০-এরও বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন, যা আজও অমূল্য সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়।

রাজা-নবাবদের প্রিয় শিল্পী

কলকাতার বাগমাটি থেকে শুরু করে বেনারস, পাটনা, রেঙ্গুন—তিনি ছিলেন বহু রাজপ্রাসাদের সাংস্কৃতিক আসরের প্রাণ। তাঁর পোশাক-আশাক, রূপচর্চা, খাদ্যাভ্যাস—সব কিছুতেই ছিল রাজকীয় মাত্রা।

উত্থান-পতনে ভরা ব্যক্তিগত জীবন

গওহরজান জন্মেছিলেন আজমিগড়ে অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান পরিবারে। তাঁর মা বেনারসে এসে নাম পরিবর্তন করে জয়মণি বাঈ হিসেবে তবলা–নৃত্য শেখা শুরু করেন। সেখান থেকেই গওহরের জীবন বদলে যায়। কিন্তু জীবনের শেষদিকে তিনি অর্থকষ্টে ভুগেছেন। রাজা-নবাবের পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আড়ম্বরপূর্ণ জীবনও ফিকে হয়ে আসে। শেষমেষ মাইসোর রাজদরবারে রাজকীয় গায়িকা হিসেবেও তিনি আগের মহিমায় ফিরতে পারেননি।

১৯৩০ সালে গওহরজান মৃত্যুবরণ করেন। শেষ জীবন ছিল নীরব, কিন্তু তাঁর জীবনকথা কখনো নিভে যায়নি।

 

সোশ্যাল শেয়ার