News বাংলার ইতিহাসে এক নিঃশব্দ উপস্থিতি: যাদের নাম জানা নেই, অথচ ছিল সমুদ্রজয়ের গল্প

বাংলার ইতিহাসে এক নিঃশব্দ উপস্থিতি: যাদের নাম জানা নেই, অথচ ছিল সমুদ্রজয়ের গল্প

সোশ্যাল শেয়ার

হরিকেল জনপদে প্রচলিত প্রাচীন মুদ্রা

বাংলাদেশের ইতিহাস কি আমরা সত্যিই পুরোটা জানি? গঙ্গারিডি, পাল বা সেন রাজবংশের বাইরে কি এই ভূখণ্ডে আর কেউ ছিল না—যারা রাজ্য গড়েছে, মুদ্রা চালু করেছে, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য করেছে? ইতিহাসের এমনই এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায় হলো প্রাচীন জনগোষ্ঠী ও জনপদ হরিকেল।

খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায়—আজকের চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায়—হরিকেল নামে একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছেই এই নামটি প্রায় অজানা, অথচ এর প্রমাণ রয়েছে মাটি খুঁড়ে পাওয়া ইতিহাসে।

হরিকেলের অস্তিত্ব শুধু পুঁথি বা ভ্রমণকাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই অঞ্চলে যে রৌপ্যমুদ্রাগুলো আবিষ্কার করেছেন, তাতে স্পষ্টভাবে উৎকীর্ণ রয়েছে ‘হরিকেল’ নাম। এসব মুদ্রা ইঙ্গিত দেয়—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী নয়, বরং সংগঠিত অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা থাকা একটি জনপদ ছিল।

গবেষকদের মতে, হরিকেল জনগোষ্ঠী ছিল সমুদ্রনির্ভর। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে তারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে নৌবাণিজ্যে যুক্ত ছিল। আরব ও চীনা লেখকদের বিবরণে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক গুরুত্বের ইঙ্গিত মেলে, যদিও বিস্তারিত বিবরণ খুব সীমিত।

ধর্ম ও সংস্কৃতির দিক থেকেও হরিকেল ছিল মিশ্র ধারার বাহক। বৌদ্ধ ও হিন্দু প্রভাব থাকলেও স্থানীয় আচার ও বিশ্বাস তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ভৌগোলিক রূপান্তরের ফলে হরিকেল নামটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

প্রশ্ন থেকে যায়—যে জনগোষ্ঠী নিজের নামের মুদ্রা চালু করেছিল, সমুদ্রপথে বাণিজ্য করত, তারা কীভাবে ইতিহাসের মূল স্রোত থেকে এমন নিঃশব্দে হারিয়ে গেল? হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এখনও রয়ে গেছে এমন আরও অনেক নাম, যাদের গল্প শোনার বাকি আছে।

সোশ্যাল শেয়ার