News বীর প্রতীকের আক্ষেপ,এখন আমরা অবহেলার শিকার

বীর প্রতীকের আক্ষেপ,এখন আমরা অবহেলার শিকার

সোশ্যাল শেয়ার

মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা কী পেলাম? যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অস্ত্র জমা দিয়েছি। আমাদের দেওয়া হয়েছিল ১০০ টাকা, একখানা কম্বল আর একটি সনদ। এরপরের ২৫ বছর ধরে আমরা কিছুই পাইনি। পরে যখন সরকার ভাতা চালু করল, তখন আমাদের অবস্থা কিছুটা বদলেছিল।

তবুও স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য আজও পূরণ হয়নি। আর এখন আমরা অবহেলার শিকার। কেউ আমাদের কার্য ও ত্যাগকে মূল্য দিতে চায় না।” এই কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের জেলার সূর্যসন্তান কোম্পানি কমান্ডার, বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকার, যিনি ১৯৭১ সালে ৯ মাস রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

স্বাধীনতার এত বছর পরও তার আক্ষেপ, সম্মান, ন্যায্যতা এবং ভবিষ্যতের কোনো আশা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, “সবাই শুধু ক্ষমতায় পৌঁছানোর দিকে ব্যস্ত।” ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের আগে, ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিসংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাকে পরাজিত করে শহরকে হানাদারমুক্ত করেছিলেন। সেই সময় কুড়িগ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন হয়েছিল বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে।

গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সহকারী কমান্ডার থেকে কোম্পানি কমান্ডার হওয়া এই বীর প্রতীক মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি বর্ণনা করেছেন। বীর প্রতীক আব্দুল হাই বলেন, “আমি অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর জীবিকার তাগিদে ঢাকা আগারগাঁওয়ের টোবাকো কোম্পানিতে চাকরি শুরু করি। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান আমি। বয়স তখন ১৫ বা ১৬। স্বাধীনতার ডাক পেয়ে ঘরে থাকতে পারিনি।

প্রশিক্ষণ নিতে গেলাম। প্রথম ব্যাচে বাদ পড়লাম, তবুও হার মানিনি। দ্বিতীয় ব্যাচেও অংশ নিলাম। তখনও প্রথমে বাদ পড়েছিলাম, কারণ দেখতে হালকা-পাতলা ছিলাম। অনেক অনুরোধের পরই ভর্তি হতে পারি। ৮ এপ্রিল ১৯৭১ থেকে আমার প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ভারত থেকে সীমান্ত পার হয়ে ১৫ এপ্রিল কুড়িগ্রামে ফিরি। যুক্ত হই ৬ নম্বর সেক্টরে। বাড়ি গিয়ে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করি এবং তারপর সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিই।”

তিনি বলেন, “আমি ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম না। সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছি, মাইন পুতেছি, বোমা মেরেছি।” মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক মিশনে অংশ নিয়েছেন। স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের জুনে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় সোনাহাট ব্রিজ ধ্বংসের অপারেশনে আমরা অংশ নিই। ভারতীয় একজন কমান্ডারের নেতৃত্বে সোনাহাট সেতুতে বোমা ফাটাই। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেই এলাকায় টহল দিতে পারেনি।”

হালাবট অপারেশনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “কুড়িগ্রাম সদর এলাকার হালাবট এলাকায় রেললাইনে বোমা পুতেছিলাম। এই অপারেশনে ২৫ জন পাক হানাদার নিহত হয়। আমাদেরও দুজন শহীদ হয়। পুরো ট্রেন ধ্বংস হয়নি, কারণ তারা ইঞ্জিনের সামনে একটি ফাঁকা বগি রেখেছিল। তবু আমরা সম্মুখ যুদ্ধে তাদের ২০–২৫ জনকে মেরে ফেলেছি।”

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব নিয়ে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠিত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। আমরা যুদ্ধ করেছি জাতির মুক্তির জন্য, প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদের জন্য। এ বাস্তবায়ন হলে মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বাধীনতার এত বছরেও তা অর্জিত হয়নি। জুলাই আন্দোলন বিপ্লব হয়েছে, কিন্তু বিপ্লবী সরকার হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী শপথ নেওয়া হলেও, জুলাই সনদ কার্যকর হয়নি। তাহলে কী হলো?”

তিনি আরও বলেন, “লুটপাট চলছে। এখন মবের শাসন চলছে, মব সন্ত্রাস ঘটছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কোনো রাজনৈতিক দল বাস্তবায়ন করছে না। সবাই শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেউ নেই।”

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আগে, ৬ ডিসেম্বর বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল বিকেল ৪টায় কুড়িগ্রামে প্রবেশ করে। নতুন শহরের ওভারহেড পানির ট্যাংকে (বর্তমানে সদর থানার উত্তরে) স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে বিজয় বার্তা ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে তাকে বীর প্রতীক খেতাবের সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

সোশ্যাল শেয়ার