একটি সকাল। জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়িতে হাজির হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দু’জনের মধ্যে তখনও মুখোমুখি দেখা হয়নি। বিজ্ঞানী বাইরে ছিলেন। কবি তাঁর টেবিলেই রেখে গেলেন একটি ম্যাগনোলিয়া ফুল—নীরব অভিবাদন, গভীর শ্রদ্ধা এবং এক বন্ধুত্বের সুন্দর সূচনা।
সংযোগের এই ফুলই যেন পরে দুই প্রতিভাধরের মধ্যে গড়ে তোলে আজীবন অটুট, বিশ্ববন্দিত এক সম্পর্ক—রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র বসুর বন্ধুত্ব। বাংলা সমাজে তারা ছিলেন দুই মেরুর মানুষ—একজন কবিতা, চিন্তা, সঙ্গীতের বিশ্বকবি; অন্যজন প্রকৃতির অন্তঃস্থলে লুকানো স্নায়ুতন্ত্রের রহস্য উদ্ঘাটন করা এক অসাধারণ বিজ্ঞানী। তবু দু’জনের অন্তরজগতকে যেন এক অদৃশ্য সুতো বেঁধে রেখেছিল—পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা এবং গভীর মানবিকতা।
বন্ধুত্বের শুরু: ‘আপনি’ থেকে প্রীতিময় ‘তুমি’
১৮৯৭ সালে প্রথমবার বিদেশ থেকে ফিরে ধর্মতলায় ভগ্নীপতি আনন্দমোহন বসুর বাড়িতে উঠেছিলেন জগদীশচন্দ্র। তখন তাঁর আবিষ্কার ও গবেষণা নিয়ে দেশজুড়ে উত্তেজনা। সেই সময়ই প্রথমবার দেখা করতে যান রবীন্দ্রনাথ। অল্পদিনের মধ্যেই ‘আপনি’ হয়ে যায় ‘তুমি’। রবি ঠাকুর এক চিঠিতে লিখেছিলেন— “তোমার সার্কুলার রোডের ক্ষুদ্র কক্ষটি এবং মাছের ঝোলের আস্বাদন আজও মনে পড়ে।” সেই স্মৃতির মতোই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব জমে ওঠে দুই মহাপুরুষের মধ্যে।

শিলাইদহের সন্ধ্যা–রাত: গল্প, গবেষণা আর নদীপথের আলাপন
পদ্মাপারের শিলাইদহে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ। প্রতি মাসের শেষ শনিবার সেখানে এসে দু’ রাত কাটাতেন জগদীশচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী অবলা। বিজ্ঞানীর জন্য থাকত আলাদা বজরা। সন্ধ্যায় নদীপথে পাশাপাশি বসে চলত দীর্ঘ আলাপন— রবীন্দ্রনাথের নতুন গল্প, আর জগদীশচন্দ্রের নতুন গবেষণা।
জগদীশচন্দ্র প্রতিবার আবদার করতেন—“নতুন গল্প শোনাতে হবে।” বন্ধুর আবদার কবি রাখতেনই। গবেষণার গল্পেও কবি হারিয়ে যেতেন মোহে।
বন্ধুত্বে মানবিকতা: “তোমার কর্ম অসম্পন্ন রেখে ফিরো না”
দ্বিতীয় বিদেশ যাত্রায় নানা সমস্যায় পড়েন জগদীশচন্দ্র। তাঁর আরও দিন থাকা জরুরি হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ তখন কেবল কথায় নয়—কর্মে পাশে দাঁড়ালেন।
১২ ডিসেম্বর ১৯০০ সালে লেখা চিঠিতে তিনি বললেন— “যেমন করিয়া হোক তোমার কার্য অসম্পন্ন রাখিয়া ফিরিয়া আসিও না… অর্থের ক্ষতি যাহাতে না হয় তাহার ভার আমি লইব।”
শুধু কথায় নয়—প্রয়োজনীয় অর্থও পাঠিয়েছিলেন। নিজের আর্থিক সংকট সত্ত্বেও ত্রিপুরার মহারাজার কাছ থেকে ১৫,০০০ টাকা এনে তিনি তা পৌঁছে দেন বিজ্ঞানীর কাছে।

‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ গঠনে রবীন্দ্রনাথের অপরিসীম ভূমিকা
বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য রবীন্দ্রনাথ শুধু অর্থ সাহায্যই করেননি, তাঁর পরিচিত মহলের কাছে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি উদ্বোধনী দিনে, কিন্তু পাঠিয়েছিলেন সেই বিখ্যাত গান— “মাতৃমন্দির পুণ্য অঙ্গন করো মহোজ্জ্বল আজ হে…”
অন্যদিকে শান্তিনিকেতন উন্নয়নের সময় একইভাবে পাশে ছিলেন জগদীশচন্দ্র। পরামর্শ, আর্থিক সাহায্য—যতটুকু দরকার, তিনি করেছেন অকপটে। দু’জন পরস্পরের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পরিচালনাতেও যুক্ত ছিলেন—
- জগদীশচন্দ্র শান্তিনিকেতনের পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি
- রবীন্দ্রনাথ বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রথম গভর্নিং বডির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য
পরস্পরের গ্রন্থ উৎসর্গ—বন্ধুত্বের আরেক রূপ
রবীন্দ্রনাথ তাঁর একাধিক গ্রন্থ—কথা, খেয়াসহ অনেক লেখা উৎসর্গ করেছিলেন জগদীশচন্দ্রকে।
জগদীশচন্দ্রও তাঁর অমূল্য গ্রন্থ The Nervous Mechanism of Plants উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে।

গর্বের মুহূর্ত: নোবেলজয়ীর প্রাপ্তিতে বিজ্ঞানীর আনন্দ
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পেলেন, জগদীশচন্দ্র আবেগে লিখেছিলেন— “আজ যে দুঃখ দূর হইল। পৃথিবীতে তোমাকে জয়মাল্য ভূষিত না দেখতে পেয়ে বেদনা অনুভব করিয়াছি।” বন্ধুত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীর আরেকটি বিখ্যাত উক্তি— “আমি কখনও একা ছিলাম না। অপ্রসিদ্ধ দিনেও রবীন্দ্রনাথ আমার সঙ্গে ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস কখনও টলে যায়নি।”
শেষ কথা: অটুট সখ্যের চিরকালীন আলো
রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র বসুর বন্ধুত্ব কেবল ব্যক্তিগত বন্ধন ছিল না—এ ছিল দুই প্রতিভার পরস্পরের প্রতিভাকে সমর্থন করার, উজ্জ্বল করার এক অসাধারণ মানবিক উদাহরণ। যেখানে কবির কলম মিলে গেছে বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে; আর বিজ্ঞানীর মেধা পেয়েছে কবির প্রশান্তিতে— সেখানে জন্ম নেয় এক অনুপম গল্প, এক চিরকালীন দৃষ্টান্ত।
গত ২৩ নভেম্বর ছিলো জগদীশচন্দ্র বসুর প্রয়াণ দিবস। আমরা স্মরণ করি শুধু একজন বিজ্ঞানীকে নয়—এক সুন্দর, নির্মল, অমলিন বন্ধুত্বের ইতিহাসকেও।