মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা সম্পর্কে প্রশ্নও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোচনায় যে তত্ত্বটি সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা হলো সিমুলেশন থিওরি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আমরা যে বাস্তবতাকে সত্য বলে মনে করি, তা আদতে একটি উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশনের ফল হতে পারে।
সিমুলেশন থিওরির ধারণাটি জনপ্রিয় করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক নিক বোস্ট্রম। তিনি ২০০৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে যুক্তি দেন—যদি কোনো উন্নত সভ্যতা অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরি করতে সক্ষম হয়, তবে তারা পূর্বপুরুষদের জীবন বা পুরো একটি মহাবিশ্ব সিমুলেশনের মাধ্যমে তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে, “বাস্তব” জগতে থাকার চেয়ে সিমুলেশনের ভেতরে থাকার সম্ভাবনাই পরিসংখ্যানগতভাবে বেশি হতে পারে।
এই তত্ত্বকে সমর্থন করে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলো গাণিতিকভাবে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, ঠিক যেমন কোনো প্রোগ্রামের কোড। আবার কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে কণার আচরণ অনেক সময় পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়—যা ভিডিও গেমে “রেন্ডারিং”-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক-সহ অনেকেই প্রকাশ্যে বলেছেন, আমরা সিমুলেশনে বাস করছি—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে সিমুলেশন থিওরি এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। অনেক বিজ্ঞানী একে দর্শনগত কল্পনা বা অনুমান হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, এই তত্ত্ব পরীক্ষাযোগ্য নয়—অর্থাৎ এমন কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে আমরা সিমুলেশনে আছি কি না। নোবেলজয়ী পদার্থবিদসহ বহু গবেষক মনে করেন, বাস্তবতার ব্যাখ্যা দিতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা মহাবিশ্বের গঠন যথেষ্ট; সিমুলেশন ধারণা অতিরিক্ত অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—যদি আমরা সিমুলেশনে থাকি, তবে “সিমুলেটর” কারা এবং তাদের উদ্দেশ্যই বা কী? এ প্রশ্নের কোনো নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো নেই। ফলে সমালোচকদের মতে, প্রমাণহীন এই তত্ত্ব মানুষের কৌতূহল উসকে দিলেও বাস্তব বিজ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে না।
সব মিলিয়ে, সিমুলেশন থিওরি আমাদের বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এটি এখনো প্রমাণিত সত্য নয়, তবে বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রযুক্তির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—যা ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণা ও বিতর্কের জন্ম দেবে।