আজ ১২ জানুয়ারি—ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গৌরবোজ্জ্বল অথচ বেদনাবিধুর স্মৃতিবহ দিন। এই দিনেই ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ শাসকদের হাতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহিদ করা হয় বিপ্লবী নেতা মাস্টার দা সূর্য সেনকে। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন আন্দোলনের প্রধান সংগঠক এবং ভারতবর্ষের বিপ্লবী ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সূর্য সেন। পেশায় শিক্ষক হওয়ায় তিনি ‘মাস্টার দা’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতা। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু তরুণ-তরুণী স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া এবং শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া। যদিও সামরিকভাবে এই অভিযান সফল হয়নি, তবু এটি ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয় এবং সারা দেশে বিপ্লবী চেতনার আগুন জ্বালিয়ে তোলে।
অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৩৩ সালে তিনি গ্রেফতার হন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর ওপর চালায় অমানবিক নির্যাতন। বলা হয়, ফাঁসির আগেও তাঁকে নির্মমভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল, এমনকি তাঁর দাঁত পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়। তবুও তিনি নিজের আদর্শ থেকে একচুলও সরে আসেননি।
১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মাস্টার দা সূর্য সেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁর দেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে গোপনে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়, যাতে তাঁর কবরও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠতে না পারে। মাস্টার দা সূর্য সেনের আত্মত্যাগ আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করাই নয়, আদর্শের প্রতি অবিচল থাকাই একজন সত্যিকারের বিপ্লবীর পরিচয়। ১২ জানুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কোনো দান নয়; এটি অর্জিত হয়েছে অগণিত শহিদের রক্তের বিনিময়ে।