News ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়

সোশ্যাল শেয়ার

বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সংঘটিত হয় ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১১৭৬ সাল)। তৎকালীন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চলে এই মন্বন্তরের প্রভাব ছিল বিধ্বংসী। ঐতিহাসিকদের মতে, এই দুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, যা সে সময়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

মন্বন্তরের প্রধান কারণ ছিল একাধিক। ১৭৬৯ সালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অমানবিক রাজস্ব নীতি। দুর্ভিক্ষের মধ্যেও কোম্পানি ভূমি কর আদায়ে কোনো ছাড় দেয়নি। ফলে কৃষকরা চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হয় এবং খাদ্য উৎপাদন ও মজুত—দুটোই ভেঙে পড়ে।

খাদ্যশস্যের তীব্র সংকট, চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কালোবাজারির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একেবারে শেষ হয়ে যায়। গ্রাম থেকে শহরে খাদ্যের সন্ধানে মানুষের ঢল নামে, কিন্তু সর্বত্রই ছিল অনাহার ও মৃত্যু। সমসাময়িক বিবরণ অনুযায়ী, রাস্তাঘাটে, বাজারে ও নদীতীরে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যেত; দাহ বা সৎকার করার মতো লোকও ছিল না।

এই মন্বন্তরের ফলে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকে, বহু গ্রাম জনশূন্য হয়ে যায় এবং হস্তশিল্প ও স্থানীয় বাণিজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে জনমনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে শাসনব্যবস্থায় কিছু সংস্কারের পথ তৈরি করে। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি ছিল উপনিবেশিক শোষণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং মানবিক উদাসীনতার করুণ পরিণতি। ইতিহাসের এই অধ্যায় আজও আমাদের সতর্ক করে দেয়।

সোশ্যাল শেয়ার